অনলাইন ডেস্ক: ‘নদী ভাঙা মানুষ কোটে পাই? হামার নাই বাড়ি, নাই ঘর। স্বামীও নাই, মানস্যের জাগাত থাকি। গোশতো কিনবার পাই না। বাড়িত যাইয়া বেটি-জামাইয়োক দাওয়াত দিম, তৃপ্তি করে একবেলা গোশতো-ভাত খামো।’

কথাগুলো বলতে বলতেই চোখ ভিজে ওঠে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার গোবিন্দি গ্রামের ষাটোর্ধ্ব মইফুল বেওয়ার। হাতে দুই কেজি কোরবানির মাংসের ব্যাগ, মুখজুড়ে তৃপ্তির হাসি। বহুদিন পর যেন ঈদ তার কাছেও একটু আনন্দ হয়ে ধরা দিয়েছে।
শুক্রবার (২৯ মে) দুপুরে সাঘাটার এসকেএস রিসোর্স সেন্টারে গিয়ে দেখা যায় এক ভিন্ন চিত্র। শত শত অসহায়, নদীভাঙা, স্বামীহারা ও কর্মহীন মানুষ টোকেন হাতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। কেউ বৃদ্ধা, কেউ বিধবা, কেউ দিনমজুর, আবার কেউ শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে এসেছেন সামান্য মাংসের আশায়। কারও হাতে পুরনো ব্যাগ, কারও হাতে পলিথিন। কিন্তু সবার চোখেই এক ধরনের অপেক্ষা, আজ হয়তো পরিবারের সবাই মিলে একটু তৃপ্তি করে মাংস-ভাত খাওয়া যাবে।

ঈদের দিনে সমাজের বিত্তবানদের ঘরে যখন কোরবানির ব্যস্ততা, মাংস ভাগাভাগি আর আত্মীয় আপ্যায়নের আয়োজন চলে, তখন নদীভাঙা এই মানুষগুলোর কাছে একবেলা মাংস-ভাতই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় আনন্দ। যাদের সারা বছর মাংস কেনার সামর্থ্য থাকে না, তাদের জন্য কোরবানির ঈদ মানে একটু স্বস্তি, একটু আশার দিন।
সাঘাটার গোবিন্দি গ্রামের আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘যৌবনকালে অভাবের সংসারেও ঈদে স্বামী ভালোবেসে চুড়ি-ফিতা, লাল পাড়ের একটা শাড়ি কিনে দিত। এখন স্বামী অসুস্থ, কাজ করতে পারে না। ছেলে-মেয়েরাও নিজেদের সংসার নিয়াই ব্যস্ত। তাই মাংস নিতে আসছি। বাড়িতে নাতি-নাতনিরা অপেক্ষা করতেছে। সবাই মিলে একসঙ্গে খামো।’
তার কথা বলতে বলতে চোখের কোণে জল জমে ওঠে। আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরও কয়েকজন বৃদ্ধা তখন মাথা নেড়ে যেন একই জীবনের গল্প শোনান।

রিসোর্স সেন্টারের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, কোথাও গরুর মাংস কাটাবাছা চলছে, কোথাও ওজন করা হচ্ছে, আবার কোথাও স্বেচ্ছাসেবকেরা ব্যাগে ভরে মানুষের হাতে তুলে দিচ্ছেন। কেউ ব্যস্ত তালিকা মিলাতে, কেউ টোকেন যাচাইয়ে। পুরো জায়গাজুড়ে যেন মানবিকতার এক বড় আয়োজন।
প্রথম দেখায় মনে হতে পারে কোনো বড় উৎসব বা সামাজিক অনুষ্ঠান চলছে। কিন্তু এই আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন যমুনা নদীর ভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষগুলো। যাদের অনেকেরই নেই নিজের ঘর, নেই স্থায়ী আয়, নেই নিরাপদ ভবিষ্যৎ। বছরের বেশিরভাগ সময়ই তাদের কাটে অনিশ্চয়তা আর অভাবের সঙ্গে লড়াই করে।
গোবিন্দি গ্রামের বৃদ্ধ আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘বছরে এই একটা দিনই ভালো করে মাংস খাওয়া হয়। বাজার থেইকা কিনে খাওয়ার সামর্থ্য নাই। তাই এই মাংস পাইয়া খুব ভালো লাগতেছে। বাড়িতে নাতিরা অপেক্ষা করতেছে, ওদের মুখে হাসি দেখলেই শান্তি লাগে।’

নদীভাঙনে বসতভিটা হারানো রহিমা খাতুন বলেন, ‘যমুনা সব নিয়ে গেছে। ঘর নাই, জমি নাই। মানুষের জায়গায় থাকি। ঈদ আইলে মন খারাপ হয়, কারণ নিজেরা কোরবানি দিতে পারি না। আজ মাংস পাইছি, নাতি-নাতনিরা খুশি হইছে। এই আনন্দই এখন বড়।’
অনেককে দেখা যায় মাংস হাতে পেয়েই ফোনে বাড়িতে খবর দিচ্ছেন। কেউ বলছেন, ‘ভাত বসাও’, কেউ বলছেন, ‘আজ সবাই মিলে খামু।’ দারিদ্র্যের মধ্যেও এই সামান্য প্রাপ্তি যেন তাদের কাছে বড় উৎসব।
আয়োজকরা জানান, এবার ১২০টি গরু কোরবানি দিয়ে চার হাজার ২০০ পরিবারের মাঝে মাংস বিতরণ করা হচ্ছে। সাঘাটার গোবিন্দি, জুমারবাড়ী এবং ফুলছড়ি উপজেলার উদাখালী এলাকায় একযোগে এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রতিটি পরিবারকে দেওয়া হচ্ছে দুই কেজি করে কোরবানির মাংস।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, এমন উদ্যোগ শুধু খাদ্য সহায়তা নয়, বরং সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার একটি মানবিক দৃষ্টান্ত।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সৈয়দ নুরুল আলম জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আগে এই এলাকার অনেক অসহায় মানুষ ঈদের দিন শহরে শহরে মাংস চাইতে যেত। এতে তারা বিব্রতও হতো। এখন সংগঠিতভাবে সম্মানের সঙ্গে মাংস বিতরণ হওয়ায় মানুষ স্বস্তি পাচ্ছে। এমন উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।’
ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশের প্রকল্প কর্মকর্তা আহসান হাবীব বলেন, ‘২০০৬ সাল থেকে ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশ এসকেএস ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে গাইবান্ধায় কোরবানির মাংস বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মূল লক্ষ্য হচ্ছে, ঈদের আনন্দ থেকে যেন অসহায় মানুষ বঞ্চিত না হন।’
এসকেএস ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক খন্দকার জাহিদ সরওয়ার বলেন, ‘শুরুতে ছোট পরিসরে একটি ইউনিয়নে এই কার্যক্রম চালু হয়েছিল। এখন তা তিন ইউনিয়নে বিস্তৃত হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও বেশি মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।’

সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও মানুষের ভিড় কমেনি। কেউ ধীরে ধীরে হেঁটে বাড়ি ফিরছেন, কেউ রিকশায় উঠছেন, কেউ আবার ব্যাগ শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের মুখে ক্লান্তি থাকলেও চোখে ছিল এক ধরনের প্রশান্তি।
ঈদের আনন্দ হয়তো সবার জীবনে সমানভাবে আসে না। কিন্তু দু’কেজি মাংস হাতে নিয়ে বাড়ি ফেরা এই মানুষগুলোর মুখের হাসি বলে দেয়, সামান্য সহানুভূতিও কখনও কখনও বড় আনন্দ হয়ে উঠতে পারে।
Leave a Reply